Key facts
- ডিসেম্বর ৩, ২০২২: প্রসিকিউটর জেনারেল মোহাম্মদ জাফর মনতাজেরি ইঙ্গিত দেন যে নৈতিকতা পুলিশ 'বিলুপ্ত করা হয়েছে' (বিবিসি)।
- অক্টোবর ২০১৯: ইরানে প্রথমবারের মতো 'গাশত-ই এরশাদ' বা নৈতিকতা পুলিশ গঠিত হয়।
- সেপ্টেম্বর ২০২২: মাসা আমিনি নৈতিকতা পুলিশের হেফাজতে মারা যান, যা দেশব্যাপী প্রতিবাদের জন্ম দেয়।
- জুলাই ২০২৩: ইরান নতুন করে কঠোর হিজাব আইন প্রয়োগ শুরু করে এবং জনপরিসরে প্রযুক্তি ব্যবহার বৃদ্ধি করে (অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল)।
- ২০২৩-২০২৪: 'পাবলিক ভার্জিল্যান্ট' বা জন-সতর্কতা বাড়াতে ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও ব্যবহার করা হয় (হিউম্যান রাইটস ওয়াচ)।
- ২০২৪: বহু নারীকে হিজাব না পরার জন্য গ্রেপ্তার বা জরিমানা করা হয়েছে (ইরান হিউম্যান রাইটস)।
- এপ্রিল ২০২৩: তেহরানের বিভিন্ন স্থানে পুনরায় নৈতিকতা পুলিশের গাড়ি ও কর্মকর্তাদের দেখা যায় (বিবিসি পার্সিয়ান)।
- ২০২৫ সাল পর্যন্ত: হিজাব আইন লঙ্ঘনের জন্য ১০ হাজারেরও বেশি নারীকে বিচার করা হয়েছে (বরুমন্দ সেন্টার)।
নৈতিকতা পুলিশ বিলুপ্তির ঘোষণা: সত্যতা যাচাই
৩ ডিসেম্বর ২০২২ তারিখে ইরানের প্রসিকিউটর জেনারেল মোহাম্মদ জাফর মনতাজেরি এক মন্তব্যে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে নৈতিকতা পুলিশ (গাশত-ই এরশাদ) 'বিলুপ্ত করা হয়েছে'। এই মন্তব্যটি তেহরানে এক সম্মেলনে তার বক্তৃতার সময় করা হয়েছিল এবং এর কোনো লিখিত বা সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়নি। তার এই মন্তব্যকে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ব্যাপকভাবে 'নৈতিকতা পুলিশ বিলুপ্তি' হিসেবে প্রচার করে, যা বিশ্বব্যাপী আলোচনার জন্ম দেয়। যাইহোক, পরবর্তীতে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম এবং অন্যান্য কর্মকর্তারা দ্রুত স্পষ্ট করেন যে মনতাজেরির মন্তব্যটি ছিল ভুল ব্যাখ্যা এবং সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে নৈতিকতা পুলিশ বিলুপ্ত করার কোনো ঘোষণা দেয়নি। এই বিভ্রান্তি গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, কিন্তু এর কোনো আইনি ভিত্তি ছিল না।
এই মন্তব্যের পরপরই, ইরানের বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী কর্মকর্তা, যার মধ্যে সংসদ সদস্যরাও ছিলেন, জোর দিয়ে বলেন যে হিজাব আইন ও এর প্রয়োগের জন্য গঠিত সংস্থাগুলো অক্ষুণ্ণ থাকবে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ফার্স নিউজ এজেন্সি জানায়, মনতাজেরি কেবলমাত্র ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে নৈতিকতা পুলিশ তার বর্তমান আকারে সম্ভবত বিলুপ্ত করা হবে, কিন্তু এর মানে এই নয় যে 'ইসলামী নৈতিকতা' প্রয়োগ করা হবে না। আসলে, ইরানের বিচার বিভাগ নৈতিকতা পুলিশের তত্ত্বাবধান করে না, বরং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকে। ফলে, একজন প্রসিকিউটর জেনারেলের পক্ষে এই ধরনের সিদ্ধান্ত এককভাবে ঘোষণা করা সম্ভব ছিল না। এই তথ্যের অভাবে, অনেক মানবাধিকার সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক শুরুতেই সতর্কতার সাথে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন, যা পরবর্তীতে সঠিক প্রমাণিত হয় (বিবিসি, রয়টার্স)।
মূলত, প্রসিকিউটর জেনারেলের মন্তব্যটি ছিল মাসা আমিনির মৃত্যুর পর চলমান ব্যাপক বিক্ষোভের চাপ কমানোর একটি প্রচেষ্টা। এই বিক্ষোভ ইরানের ইতিহাসে অন্যতম বৃহত্তম সরকারবিরোধী আন্দোলন ছিল। সরকার জনসাধারণের অসন্তোষ কমানোর জন্য কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ঘোষণা করলেও, নৈতিকতা পুলিশের বিলুপ্তি তার মধ্যে ছিল না। পরবর্তীতে, ইরানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং অন্যান্য কর্তৃপক্ষ কঠোরভাবে নিশ্চিত করে যে হিজাব আইন enforcement প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে, তবে এর কৌশলগত পরিবর্তন হতে পারে। এটি পরিষ্কার করে যে 'বিলুপ্তি' শব্দটি কেবল একটি ভুল যোগাযোগ ছিল, কোনো বাস্তব নীতি পরিবর্তন নয় (ইরানওয়্যার, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ)।
৩ ডিসেম্বর ২০২২ তারিখে ইরানের প্রসিকিউটর জেনারেলের মন্তব্যটি ছিল ভুল ব্যাখ্যা, সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে নৈতিকতা পুলিশ বিলুপ্তির ঘোষণা করেনি।
২০২৩-২০২৪: নতুন কৌশল ও প্রযুক্তি-নির্ভর প্রয়োগ
ডিসেম্বর ২০২২ সালের 'বিলুপ্তি'র ঘোষণা সত্ত্বেও, ২০২৩ সাল থেকে ইরানের কর্তৃপক্ষ হিজাব আইন প্রয়োগে আরও কঠোর এবং প্রযুক্তি-নির্ভর কৌশল গ্রহণ করেছে। সরকারের লক্ষ্য ছিল নৈতিকতা পুলিশের সরাসরি দৃশ্যমান উপস্থিতি কমিয়ে আনা, কিন্তু একই সাথে বাধ্যতামূলক হিজাব আইন কার্যকর রাখা। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, ২০২৩ সালের মাঝামাঝি থেকে হিজাববিহীন নারীদের ধরতে সিসিটিভি ক্যামেরা এবং মুখের স্বীকৃতি প্রযুক্তি ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে চিহ্নিত নারীদের কাছে প্রথমে এসএমএস নোটিশ পাঠানো হয়, যেখানে তাদের হিজাব লঙ্ঘনের জন্য আদালতে হাজির হতে বলা হয় অথবা জরিমানা করা হয়।
এই নতুন কৌশলের অংশ হিসেবে, জনবহুল স্থান যেমন শপিং সেন্টার, পার্ক, মেট্রো স্টেশন এবং অন্যান্য সরকারি ভবনে স্থাপিত সিসিটিভি ক্যামেরাগুলো সক্রিয়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদন অনুসারে, অনেক ক্ষেত্রে নারীদের ব্যক্তিগত গাড়ির ভিতরে হিজাব না পরার জন্যও জরিমানা করা হয়েছে, যা সিসিটিভি ফুটেজ বা অন্যান্য প্রত্যক্ষদর্শীর প্রতিবেদনের ভিত্তিতে করা হয়েছে। এই পদক্ষেপগুলি নৈতিকতা পুলিশের সরাসরি টহলের প্রয়োজনীয়তা কমিয়েছে কিন্তু আইনের প্রয়োগ আরও বিস্তৃত ও অদৃশ্য করে তুলেছে, যা নারীদের মধ্যে এক ধরণের constante নজরদারির অনুভূতি তৈরি করেছে।
এছাড়াও, সরকার 'পাবলিক ভার্জিল্যান্ট' বা সাধারণ নাগরিকদের দ্বারা নজরদারি বাড়ানোর জন্য প্রচার চালিয়েছে। এর ফলে, অনেক নাগরিককে হিজাববিহীন নারীদের ছবি বা ভিডিও তুলে কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানোর জন্য উৎসাহিত করা হয়েছে। এই ধরনের ডিজিটাল নজরদারি এবং জন-সতর্কতার মিশ্রণ হিজাব আইন লঙ্ঘনের জন্য ১০ হাজারেরও বেশি নারীকে বিচারের মুখোমুখি করেছে বলে বরুমন্দ সেন্টার জানিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে, হিজাব আইনের প্রয়োগ আরও ব্যক্তিগত এবং সর্বব্যাপী হয়ে উঠেছে, যা নারী অধিকারের জন্য একটি নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। (অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, বরুমন্দ সেন্টার)।
| সময়কাল | ঘটনার ধরণ | সংখ্যা | সূত্র |
|---|---|---|---|
| ডিসেম্বর ২০২২ | নৈতিকতা পুলিশ বিলুপ্তির ইঙ্গিত | ১টি ঘোষণা (প্রসিকিউটর জেনারেল) | বিবিসি |
| জানুয়ারি-জুন ২০২৩ | হিজাব আইন লঙ্ঘনের জন্য বিচার | >১,৫০০টি মামলা | ইরান হিউম্যান রাইটস |
| এপ্রিল ২০২৩ | পুনরায় নৈতিকতা পুলিশের টহল | তেহরানসহ বিভিন্ন শহর | বিবিসি পার্সিয়ান |
| জুলাই ২০২৩ | নতুন প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি | ব্যাপক ব্যবহার শুরু | অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল |
| ২০২৩ সাল | হিজাব না পরায় গ্রেফতার ও জরিমানা | হাজার হাজার নারী | বরুমন্দ সেন্টার |
| ২০২৪ সাল পর্যন্ত | ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ | শত শত প্রতিষ্ঠান | হিউম্যান রাইটস ওয়াচ |
| ২০২৫ সাল পর্যন্ত | হিজাব আইন লঙ্ঘনের জন্য মোট বিচার | >১০,০০০টি কেস | বরুমন্দ সেন্টার |
হিজাব আইন প্রয়োগের ঘটনা এবং আটক
২০২৩ এবং ২০২৪ সালে, ইরানের বিভিন্ন শহরে হিজাব আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে অসংখ্য নারী আটক, গ্রেপ্তার এবং জরিমানা করা হয়েছে। যদিও নৈতিকতা পুলিশের পুরোনো ইউনিফর্ম পরিহিত কর্মকর্তারা কম দৃশ্যমান ছিলেন, তবে এপ্রিল ২০২৩ থেকে তেহরানসহ অন্যান্য বড় শহরে তাদের পুনরায় নতুন ফর্মে বা অ-চিহ্নিত গাড়িতে টহল দিতে দেখা যায়। এর ফলে, অনেকে মনে করেন যে নৈতিকতা পুলিশ আসলে বিলুপ্ত হয়নি, বরং তাদের কাজের পদ্ধতি পরিবর্তন হয়েছে। ইরান হিউম্যান রাইটস (IHR) জানিয়েছে যে এই সময়ের মধ্যে শত শত নারীকে কেবল হিজাব না পরার জন্য গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
আটককৃত নারীদের প্রায়শই 'পুনঃশিক্ষা কেন্দ্র' বা অস্থায়ী ডিটেনশন সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে তাদের 'ইসলামী মূল্যবোধ' সম্পর্কে 'উপদেশ' দেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে, এসব নারীকে মুচলেকা দিয়ে মুক্তি দেওয়া হয়, কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া চলতে থাকে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছে যে, এই আটক অভিযানগুলো সাধারণত জনবহুল এলাকায়, বিশেষ করে তরুণীদের লক্ষ্য করে চালানো হয়। আটককৃতদের মধ্যে অনেকেই শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তেহরান, কোম, ইসফাহান এবং শিরাজ শহরের মতো স্থানগুলিতে হিজাব আইন প্রয়োগের ঘটনা বিশেষভাবে বেশি ছিল। উদাহরণস্বরূপ, জুন ২০২৩-এ ইরানের বিচার বিভাগ জানায় যে, গত এক মাসে হিজাব আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে ১,৫০০টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এছাড়াও, বিভিন্ন দোকান এবং ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানকে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, কারণ তাদের কর্মীরা হিজাব পরেনি বা তাদের গ্রাহকদের মধ্যে হিজাববিহীন নারী ছিলেন। এসব পদক্ষেপ স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয় যে, নৈতিকতা পুলিশ তার নাম বা পদ্ধতি পরিবর্তন করলেও, তার মৌলিক লক্ষ্য ও কার্যকারিতা অব্যাহত রয়েছে। (ইরান হিউম্যান রাইটস, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল)।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও মানবাধিকার সংস্থার পর্যবেক্ষণ
ইরানের নৈতিকতা পুলিশের বিলুপ্তি না হওয়া এবং হিজাব আইনের ক্রমাগত কঠোর প্রয়োগের বিষয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল একাধিকবার ইরান সরকারের বিরুদ্ধে নারী অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এনেছে, বিশেষ করে বাধ্যতামূলক হিজাব আইন এবং এর কঠোর প্রয়োগের বিরুদ্ধে। তারা ইরানকে জাতিসংঘের নারী অধিকার কমিশন থেকে বহিষ্কারের আহ্বান জানিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে ইরানের ওপর চাপ বাড়ানোর অনুরোধ করেছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচও ইরানের নতুন প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি পদ্ধতি এবং হিজাব আইন প্রয়োগের জন্য সাধারণ নাগরিকদের ব্যবহারের নিন্দা জানিয়েছে। সংস্থাটি বলেছে যে এই কৌশলগুলো নারীদের উপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করছে এবং তাদের মৌলিক স্বাধীনতাকে খর্ব করছে। তারা ইরান সরকারকে বাধ্যতামূলক হিজাব আইন বাতিল করার আহ্বান জানিয়েছে এবং এই ধরনের নিপীড়নমূলক আইন প্রয়োগ বন্ধ করার জন্য আন্তর্জাতিক চাপ তৈরির গুরুত্ব তুলে ধরেছে।
বরুমন্দ সেন্টার এবং ইরান হিউম্যান রাইটস (IHR) এর মতো সংস্থাগুলো ইরান সরকারের দমনমূলক কৌশলের তথ্য সংগ্রহ ও নথিভুক্ত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তারা হিজাব আইন লঙ্ঘনের জন্য গ্রেপ্তার, আটক এবং দণ্ডিত হওয়া হাজার হাজার নারীর কেস নথিভুক্ত করেছে। এই সংস্থাগুলো আন্তর্জাতিক ফোরামে ইরানের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে ক্রমাগত প্রতিবেদন জমা দিচ্ছে, যাতে বিশ্ব ইরানের অভ্যন্তরে নারীদের পরিস্থিতির ভয়াবহতা সম্পর্কে অবগত হয়। তাদের প্রতিবেদন অনুসারে, ইরানের নারীরা এখনো বাধ্যতামূলক হিজাব আইন এবং নৈতিকতা পুলিশের (বা এর পরিবর্তিত রূপের) নজরদারির শিকার (অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, বরুমন্দ সেন্টার)।
সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান এবং ভবিষ্যতের দিক
ইরান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে বারবার নিশ্চিত করেছে যে বাধ্যতামূলক হিজাব আইন একটি ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের অপরিহার্য অংশ এবং এটি কোনো অবস্থাতেই শিথিল করা হবে না। দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি একাধিকবার জোর দিয়েছেন যে হিজাব 'শারিয়াহ আইনের একটি অপরিহার্য প্রয়োজন' এবং এটি লঙ্ঘন করা 'ইসলামী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে একটি ষড়যন্ত্র' হিসেবে দেখা হয়। প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসিও হিজাব আইন কঠোরভাবে প্রয়োগের পক্ষে তার সমর্থন জানিয়েছেন এবং এর জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন।
সরকারের এই অনমনীয় অবস্থান থেকে বোঝা যায় যে, নৈতিকতা পুলিশ বিলুপ্তির দাবিটি সম্পূর্ণরূপে ভিত্তিহীন ছিল এবং এটি কেবল একটি ভুল বোঝাবুঝি। ভবিষ্যতে, ইরান সরকার হিজাব আইন প্রয়োগে আরও নতুন প্রযুক্তি এবং পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারে। এর মধ্যে মুখের স্বীকৃতি প্রযুক্তিকে আরও উন্নত করা, জনপরিসরে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ব্যবহার করে হিজাববিহীন ব্যক্তিদের শনাক্ত করা এবং অনলাইনে হিজাব লঙ্ঘনের জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
সর্বোপরি, যদিও নৈতিকতা পুলিশের নাম বা টহলের ধরন পরিবর্তিত হতে পারে, হিজাব আইনের প্রয়োগ ইরানের একটি কেন্দ্রীয় নীতি হিসেবেই থাকবে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো আশঙ্কা করছে যে, ইরানের নারীরা আগামী বছরগুলোতেও এই দমনমূলক আইনের শিকার হতে থাকবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ক্রমাগত চাপ এবং অভ্যন্তরীণ প্রতিবাদের মুখে সরকার কিছু কৌশলগত পরিবর্তন আনলেও, মৌলিক নীতিগত পরিবর্তন এখনো পর্যন্ত অসম্ভব মনে হচ্ছে। (বিবিসি, রয়টার্স, ইরানওয়্যার)।
Takeaways
- ইরান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে নৈতিকতা পুলিশ বিলুপ্তির ঘোষণা করেনি, প্রসিকিউটর জেনারেলের মন্তব্যটি ছিল ভুল ব্যাখ্যা বা তাৎক্ষণিক মন্তব্য।
- মাসা আমিনির মৃত্যুর পর নৈতিকতা পুলিশের সরাসরি দৃশ্যমান উপস্থিতি কমে এলেও, হিজাব আইন প্রয়োগের পদ্ধতি আরও কঠোর ও প্রযুক্তি-নির্ভর হয়েছে।
- ২০২৩ সাল থেকে সিসিটিভি, মুখের স্বীকৃতি প্রযুক্তি এবং সাধারণ নাগরিকদের রিপোর্ট ব্যবহার করে হিজাব আইন লঙ্ঘনের ঘটনা শনাক্ত ও শাস্তি দেওয়া হচ্ছে।
- আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো ইরানের হিজাব আইনের নতুন প্রয়োগকে নারী অধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে দেখছে।
- ইরানের বিভিন্ন শহরে নৈতিকতা পুলিশের কর্মীরা ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন রূপে উপস্থিত থেকেছে এবং গ্রেফতার করেছে।
Frequently asked questions
ইরান কি সত্যিই তার নৈতিকতা পুলিশ বিলুপ্ত করেছে?
না, ইরান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে নৈতিকতা পুলিশ (গাশত-ই এরশাদ) বিলুপ্ত করেনি। ডিসেম্বর ২০২২ সালে তৎকালীন প্রসিকিউটর জেনারেল মোহাম্মদ জাফর মনতাজেরির একটি মন্তব্যকে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ভুলভাবে বিলুপ্তি হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিল। পরবর্তীতে, ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম এবং কর্মকর্তারা পরিষ্কার করে জানান যে এমন কোনো সরকারি ঘোষণা হয়নি এবং হিজাব আইন প্রয়োগ অব্যাহত থাকবে (বিবিসি, রয়টার্স)।
ডিসেম্বর ২০২২ সালের পর নৈতিকতা পুলিশের কার্যক্রম কেমন ছিল?
ডিসেম্বর ২০২২ সালের পর নৈতিকতা পুলিশের দৃশ্যমান টহল কিছুটা কমে এলেও, এর কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ হয়নি। বরং, ২০২৩ সাল থেকে ইরান সরকার হিজাব আইন প্রয়োগে নতুন এবং আরও কঠোর পদ্ধতি গ্রহণ করেছে, যেখানে সিসিটিভি ক্যামেরা, মুখের স্বীকৃতি প্রযুক্তি এবং সাধারণ নাগরিকদের অভিযোগের ভিত্তিতে আইন লঙ্ঘনকারীদের চিহ্নিত করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে, নৈতিকতা পুলিশের কর্মীরা ভিন্ন পোশাকে বা অ-চিহ্নিত গাড়িতে টহল দিচ্ছে (অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ)।
নৈতিকতা পুলিশ কোন আইন প্রয়োগ করে এবং এর উদ্দেশ্য কী?
নৈতিকতা পুলিশ, যা 'গাশত-ই এরশাদ' নামে পরিচিত, ইসলামিক পোশাকবিধি এবং সামাজিক রীতিনীতি সংক্রান্ত আইন প্রয়োগ করে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো নারীদের জন্য বাধ্যতামূলক হিজাব আইন এবং পুরুষ ও মহিলাদের জন্য অন্যান্য 'অনৈতিক' আচরণ প্রতিরোধ করা। ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের পর থেকে ইরানে এই ধরনের পোশাকবিধি ও সামাজিক রীতিনীতি সংক্রান্ত আইন কঠোরভাবে কার্যকর করা হয় (বরুমন্দ সেন্টার)।
নৈতিকতা পুলিশের বিলুপ্তি না হলে, মাসা আমিনির মৃত্যুর পর কী পরিবর্তন হয়েছে?
মাসা আমিনির মৃত্যুর পর দেশব্যাপী তীব্র বিক্ষোভের মুখে নৈতিকতা পুলিশের টহল কার্যক্রম সাময়িকভাবে কমিয়ে আনা হয়েছিল। তবে, বিলুপ্তি না ঘটিয়ে সরকার হিজাব আইন প্রয়োগের পদ্ধতি পরিবর্তন করেছে। এখন সরাসরি রাস্তার টহলের পরিবর্তে প্রযুক্তি-নির্ভর নজরদারি এবং নাগরিকদের অভিযোগের ভিত্তিতে অপরাধ শনাক্ত করা হয়। যারা হিজাব আইন লঙ্ঘন করে, তাদের প্রায়শই এসএমএস নোটিশ পাঠানো হয়, জরিমানা করা হয় বা আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি করা হয় (ইরান হিউম্যান রাইটস, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল)।
২০২৩-২০২৪ সালে হিজাব আইন প্রয়োগের জন্য ইরান কী নতুন কৌশল নিয়েছে?
২০২৩-২০২৪ সালে ইরান সরকার হিজাব আইন প্রয়োগের জন্য বিভিন্ন নতুন কৌশল অবলম্বন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে জনবহুল স্থানে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করে চেহারা শনাক্তকরণ প্রযুক্তির ব্যবহার, গণপরিবহন এবং দোকানে হিজাববিহীন নারীদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা, এবং সাধারণ নাগরিকদের কাছে 'ভার্চুয়াল টহল' ও তথ্য জানানোর আহ্বান। এছাড়া, হিজাব লঙ্ঘনের জন্য ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া বা জরিমানা করা হয়েছে (হিউম্যান রাইটস ওয়াচ)।
Entities: Mohammad Jafar Montazeri · Mahsa Amini · Ghasem Rezaei · Ali Khamenei · Ebrahim Raisi · Amnesty International · Human Rights Watch · Iran Human Rights (IHR) · BBC · Reuters · IranWire · Boroumand Center · Islamic Revolutionary Guard Corps (IRGC) · Gasht-e Ershad · Compulsory Hijab Law · Tehran · Qom · Isfahan · Women, Life, Freedom Movement
Sources
- Iran says morality police disbanded; no official confirmation yet
- Iranian Media Backtracks on Morality Police Disbandment Claim
- Abdorrahman Boroumand Center
- The Price of Freedom: Iran’s Campaign of Digital Surveillance and Harassment Against Women and Girls
- BBC News — Iran coverage
- Human Rights Watch — Iran
- Amnesty International — Iran


